একসময় ২ টাকা মজুরিতে কাজ করা এই মহিলা আজ নিজের দমে তৈরি করেছেন ২০০০ কোটি টাকার ব্যবসা

বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করে চলেছে। প্রতি মুহূর্তে নিজেকে প্রমাণিত করে চলেছে। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে পুরুষদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। কিন্তু আজও বহু স্থানে নারী জন্ম নেওয়ার আগেই তাকে গর্ভে মেরে দেওয়া হয়। জীবন কেড়ে নেওয়া হয় কন্যা সন্তানের। সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয় না তাদের। শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গুলি এখনো বহু পরিবারের পুরুষরা নেন।

কিন্তু মহিলারা যে কারোর থেকে কম নয় কারো একবার প্রমাণ করে দেন কল্পনা সরোজ নামে এক নারী। এই নারী কামানি টিউবসের সিইও। জীবনে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন বহুবার কিন্তু তারপরেও নিজের পরিচয় তৈরি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তিনি। আজ কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন শুধুমাত্র নিজের পরিশ্রমের ফলে।

মহারাষ্ট্রের আকোলা জেলার একটি ছোট্ট গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। কল্পনা সরোজের বাবা ছিলেন একজন পুলিশ কনস্টেবল যার মাসিক বেতন ছিল মাত্র ৩০০ টাকা। পরিবারের ৬ টি পেট চালাতে হতো কল্পনার বাবাকে। পারিবারিক আর্থিক অবস্থা সঙ্গীন থাকার কারণে কল্পনাকে ১২ বছর বয়সে বিবাহ দিয়ে দেওয়া হয় ১০ বছরের বড় একজন মানুষের সাথে।

শ্বশুরবাড়ির প্রত্যেকের অত্যাচারে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে যান কল্পনা। শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি বাবা মার কাছে ফিরে আসেন। শশুর বাড়ির সদস্যদের শারীরিক নির্যাতনের জন্য কল্পনা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পর যখন কল্পনা বাড়িতে ফিরে আসে তখন পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে তাদের বাড়ির সদস্যদের এক ঘরে করে দেওয়া হয়।

কিন্তু আস্তে আস্তে কল্পনা ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কাপড় সেলাই করে জীবন অতিবাহিত করেন তিনি। এরপর একদিন গার্মেন্টস কোম্পানিতে চাকরি পান, যেখানে এক দিনে দু টাকা মজুরি দেওয়া হতো তাঁকে। কিছু মাস সেখানে চাকরি করার পর কল্পনা ব্যক্তিগতভাবে ব্লাউজ সেলাই করতে শুরু করেন। একটি ব্লাউজ এর জন্য তিনি নিতেন ১০ টাকা। এর মধ্যেই চিকিৎসা না হওয়ার কারণে কল্পনার অসুস্থ বোনের মৃত্যু হয়। কঠোর পরিশ্রম করে কল্পনা নিজের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে শুরু করেন।

একটা সময় কল্পনা নিজের ব্যবসা শুরু করার চেষ্টা করেন। টেলারিং- এর মাধ্যমে নিজের ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন তিনি। সরকার থেকে ঋণ নিয়ে একটি সেলাই মেশিন এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে তিনি একটি বুটিক খুলে ফেলেন এবং দিনরাত পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেন।

একসময় কল্পনার কঠোর পরিশ্রম দেখে সুপ্রিম কোর্ট কামানি টিউব, নামক একটি কোম্পানি চালু করতে বলেন যেটি ১৭ বছর ধরে বন্ধ ছিল। কোম্পানির কর্মীরা কল্পনার সঙ্গে দেখা করেন এবং কোম্পানি পুনরায় চালু করার জন্য সাহায্যের আবেদন জানান। কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্যোগের ফলে প্রায় ১৭ বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি কোম্পানী আরো একবার চালু করেন কল্পনা। কল্পনা যখন কোম্পানির দায়িত্ব নেন তখন কোম্পানির কর্মীরা বহু বছর পর আরও একবার আশার আলো দেখেন।

আজ কল্পনার কঠোর পরিশ্রমের ফল কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে কামানি টিউবস। ভারত সরকার কল্পনাকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মশ্রী দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। শুধু তাই নয়, রাজীব গান্ধী রচনা ছাড়াও আরো অনেক পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন কল্পনা। আজ ৭০০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একটি কোম্পানির মালিক মিসেস কল্পনা। শুধু তাই নয়, কল্পনা সরোজ জি কামানি স্টিল, কে এস ক্রিয়েশন, কল্পনা বিল্ডার্স অন্ড ডেভেলপার্স, কল্পনা অ্যাসোসিয়েটের মতো কয়েক ডজন কোম্পানির মালিক। আজ কল্পনা সেই সমস্ত মহিলাদের জন্য অনুপ্রেরণা যারা কষ্টের কারণে নিজের জীবনের হাল ছেড়ে দেয়।