ভারতের মধ্যেই রয়েছে এমন এক স্কুল যেখানে শিশুরা বেতন হিসাবে টাকা নয় বরং সপ্তাহে জমা দেয় ২৫ টি প্লাস্টিক

এ এক অদ্ভুত স্কুল,  যেখানে শিক্ষা কেবল পুঁথিগত নয়, শিক্ষা ব্যবহারিক জীবনের৷ ব্যাগের বোঝা নেই, শিক্ষক-শিক্ষিকার চোখ রাঙানি নেই। পড়ুয়ারা এখানে জীবনের পাঠ নেয়। স্কুলের বেতন দেওয়ার জন্য টাকাপয়সা লাগে না । বেতন হিসেবে পড়ুয়াদের জমা দিতে হয় প্লাস্টিক।  বিশ্ব উষ্ণায়নের যুগে দূষণমুক্ত পৃথিবী গড়তে অসমের প্রত্যন্ত এলাকার একটি স্কুল এভাবেই  প্লাস্টিক-দূষণ প্রতিরোধে নতুন দিশা দেখাচ্ছে।

গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে পামোহিতে গাছপালা ঘেরা এই স্কুলের নাম অক্ষর।  ২০১৬ সালে পারমিতা শর্মা এবং মজিন মুখতার এর হাত ধরে এই স্কুলের পথ চলা শুরু৷  পামোহির অধিকাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে, এখানকার মানুষজনের পেশা হয় পাথর কাটা, না হলে রাজমিস্ত্রী।  অভাবের সংসারে ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠানোটা তাঁদের কাছে বিলাসিতা। তাই ছোট থেকেই অশিক্ষা আর অপুষ্টি তাদের নিত্যসঙ্গী। এমন একটা জায়গায় এই  অত্যাধুনিক স্কুল তৈরির পরিকল্পনা  অবিশ্বাস্য মনে হলেও,এটা সত্যি৷

মজিনের জন্ম নিউ ইয়র্কে। সেখানকার একটি স্কুলে মজিন শিক্ষকতা করতেন৷ স্কুলের প্রজেক্ট নিয়ে ২০১৫ সালে মজিন ভারতে আসেন। পামোহিতে দেখা হয় পারমিতার সঙ্গে । টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেস (TISS)-এ মাস্টার্স করছেন পারমিতা,বিষয়  সোশ্যাল ওয়ার্ক। পামোহির শিশু শ্রমিকদের অবস্থা দেখে  বিদেশে ফিরে  যান নি মজিন৷  দেশের মাটিতেই দেশের মানুষজনের জন্য কাজ করার সংকল্প করেন। বিয়ের পর পরই  স্কুল তৈরি হয়,ছোট্ট স্কুলের আনাচ কানাচ সাজিয়ে তোলেন যুগলে। নাম দিলেন অক্ষর৷

আগে প্রতিদিন বিরাট এলাকা জুড়ে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ডাঁই করে আগুন দিয়ে দেন বাসিন্দারা। এই প্লাস্টিক যে কতটা ক্ষতিকরা,  তা বোঝাতেই অনেকদিন সময় লাগে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসার কাজ শুরু হয়৷ দিনমজুর থেকে চা শ্রমিক— অভাবী পরিবার থেকে এই স্কুলে পড়তে আসে শিশুরা। ২০১৬ সালে স্কুলে পড়ুয়াদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ জন।

 

বেতন  হিসেবে পড়ুয়াদের  নিজের বাড়ির বা এলাকার, যেখানে যত প্লাস্টিক রয়েছে ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত সব কিছু নিয়ে এসে জড়ো করে  সপ্তাহে গড়ে ২৫টি করে প্লাস্টিকের যে কোনও সামগ্রী জমা করতেই হবে স্কুলে।

ভারতের এমন কিছু সম্মানীয় ব্যক্তি যারা খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছলেও তাদের পা সর্বদা মাটিতে

কিন্তু অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী,  তারা শুধুমাত্র পড়াশোনা করানোর জন্য স্কুলে নিজেদের সন্তানদের পাঠাতে রাজি ছিলেন না। তাই সপ্তাহে যত প্লাস্টিক জমা হয় স্কুলে, সেগুলো দিয়ে ইকো-ব্রিক (Eco-Brick) তৈরি করা হয় অক্ষরে। স্কুলের ভিতরেই প্লাস্টিক থেকে বায়োডিগ্রেডেবল সামগ্রী তৈরির অনুমোদন দিয়েছে নর্থ-ইস্ট এডুকেশন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। ছাত্রছাত্রীরা বানায় এই ইকো-ব্রিক।

বোতলের ভিতরে এমন ভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য ঠেসে ঢোকানো হয় যাতে স্তরের পর স্তর তৈরি হয়। এই বোতল বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা যায়।  কোনও নির্মাণ কাজে ইটের বদলে পরিবেশবান্ধব এই ইকো-ব্রিক ব্যবহার করা হয়। এতে ইট-ভাটার দূষণও রোধ করা যায়। ইকো-ব্রিকের ধারণা প্রথম আনেন জার্মান আর্কিটেক্ট আন্দ্রেজ ফ্রোসে ২০০০ সালে। ২০০৩ সালে নিকারাগুয়ায় অ্যালভারো মোলিনা প্লাস্টিক দিয়ে ইকো-ব্রিক তৈরি শুরু করেন।

অক্ষরে যারা পড়েন সেইসব ছাত্রছাত্রীরা  হাতেকলমে ইকো-ব্রিকিং শেখে৷ইকো-ব্রিক তৈরি করে স্কুলের বেশিরভাগ খরচ তোলে পড়ুয়ারাই। তা ছাড়াও নানা হস্তশিল্পের জিনিসপত্রও তৈরি করে তারা নিজেরাই। বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাতে স্কুলে রয়েছে সোলার প্যানেল ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ওপেন স্কুলিং (NIOS)’-এর তত্ত্বাবধানে বোর্ড পরীক্ষা দেয় এখানকার দশম ও দ্বাদশের ছাত্রছাত্রীরা। টাকাপয়সার হিসেব রাখার পদ্ধতিও শেখাতে বাচ্চাদের খেলনা টাকা দেওয়া হয়৷  নিচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের প্রাইভেট টিউশন দেওয়ার দায়িত্ব থাকে উঁচু ক্লাসের পড়ুয়াদের।

পরীক্ষার রেজাল্ট  পড়ুয়াদের সৃজন ক্ষমতা, জ্ঞান, শেখার আগ্রহ এর ওপর নির্ভর করে ।  তাই এই স্কুলে কোনও প্রতিযোগিতা নেই।স্কুলের নিজস্ব একটা অ্যানিমাল শেল্টার পথ কুকুরদের আশ্রয়। এটার দেখভাল করে ছাত্ররা৷ ২০১৮ সালে এই স্কুলের খরচ চালানোর দায়িত্ব নেয় অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেড। অসমের ‘অক্ষর’কে অনুকরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লির পাঁচটি সরকারি স্কুল।  আগামী পাঁচ বছরে দেশ জুড়ে এমন একশোটিরও বেশি স্কুল তৈরির স্বপ্ন রয়েছে মজিন-পারমিতার।