পরিবেশ বান্ধব বাড়ি তৈরি করেছে তামিলনাড়ুর এই ব্যাক্তি, গ্রীষ্মকালেও প্রয়োজন হয় না AC-র

প্রচণ্ড গরমে বিপাকে পড়েছেন সবাই। এই গরমের দাবদাহ থেকে স্বস্তি পেতে মানুষ বাড়িতে এসি, কুলার ইত্যাদি ব্যবহার করছেন, কিন্তু তাসত্ত্বেও প্রাকৃতিক শীতলতা অনুভব হয় না এবং একই সাথে বিদ্যুতের ব্যবহারও বেশি হয়, যার কারণে বিপুল বিদ্যুতের বিল দিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে, মানুষ এখন প্রকৃতির মাঝে থাকতে পছন্দ করছেন এবং এর জন্য তারা তৈরি করছেন পরিবেশবান্ধব বাড়ি। তামিলনাড়ুর মণিকন্দন সত্যবালানও এমন একটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন, যা গ্রীষ্মের মরসুমেও ভিতর থেকে একেবারে ঠান্ডা থাকে। এই বাড়িটি এতটাই চমৎকার এবং আরামদায়ক যে, রাজ্যে প্রচণ্ড গরম থাকলেও এতে এসি, কুলার চালানোর প্রয়োজন নেই। আসুন জেনে নেওয়া যাক মণিকন্দন এবং তাঁর বাড়ি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।


মণিকন্দন সত্যবালান ব্যাঙ্গালোরে বাস করেন এবং তিনি একজন ভিজ্যুয়াল এফেক্ট প্রযোজক। তাঁর স্ত্রী ইন্দুমতি, যিনি একজন শিক্ষিকা। মণিকন্দনের বাবা চেয়েছিলেন, মণিকন্দন তাঁর দিদার পুরানো বাড়ির জায়গায় একটি নতুন বাড়ি তৈরি করুক এবং মণিকন্দন তাঁর বাবার স্বপ্ন পূরণের ইচ্ছায় তামিলনাড়ুর পুদুকোট্টাই জেলার কিরামঙ্গলম গ্রামে অবস্থিত তাঁর দিদার পুরনো বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি পুরানো বাড়ির জায়গায় একটি খুব সুন্দর পরিবেশবান্ধব খামার বাড়ি তৈরি করেন এবং এর নাম দেন “ভালিয়াম্মাই মেডোজ”। বাবার স্বপ্ন পূরণে মণিকন্দনের স্ত্রী ইন্দুমতিও তাকে সমর্থন করেন এবং পরিবেশবান্ধব বাড়ি তৈরি করতে মণিকন্দন তাঁর স্থপতি বন্ধু তিরুমুরুগানের সাহায্য চেয়েছিলেন।

থিরুমুরুগান পরিবেশ বান্ধব বাড়ি সম্পর্কে সম্পূর্ণ তথ্য দেনএবং একটি বাড়ির নকশাও তৈরি করে দেন। এরপর সেই নকশা অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন মণিকন্দন। পরিবেশবান্ধব বাড়ি তৈরির জন্য ছয় ফুট উঁচু পাথর দিয়ে ভিত্তিও স্থাপন করেন মণিকন্দন। ঘরের পিলার নির্মাণে তিনি কংক্রিটের পিলার ব্যবহার করেননি। বর্তমানে নির্মিত বাড়িগুলোতে ইট, সিমেন্টের ব্যবহার বেশি হওয়ায় ঘরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। এমন পরিস্থিতিতে, পরিবেশবান্ধব বাড়ির তাপমাত্রা ভিতর থেকে ঠান্ডা রাখতে নির্মাণের সময় কম পরিমাণ ইট, সিমেন্টের ব্যবহার করেন মণিকন্দন। ঘরের দেয়াল মজবুত করতে তিনি একটি বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছেন, যাঁর নাম ‘রাট ট্র্যাপ বন্ড’, এছাড়া ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা ভারসাম্য রাখতে এবং বাতাসের আদান প্রদানের জন্য কিছু জায়গা রেখে দেন।

বাড়ির ছাদ নির্মাণে আরসিসি ব্যবহার না করে “ফিলার স্ল্যাব কৌশল” ব্যবহার করেন। ফিলার স্ল্যাব এমন একটি কৌশল, যেখানে ছাদ তৈরিতে সিমেন্টের পরিবর্তে প্রাকৃতিক উপকরণ, যেমন গোবর ও মাটি ইত্যাদি দিয়ে তৈরি উপাদান ব্যবহার করা হয়। মণিকন্দন পরিবেশবান্ধব বাড়ির ছাদ তৈরিতে মাটির বাটি ব্যবহার করেছেন। এই কৌশলে ছাদ তৈরিতে ২০ শতাংশ সিমেন্ট, স্টিল এবং ৮০ শতাংশ মাটি, প্রাকৃতিক জিনিস ব্যবহার করা হয়, যাতে কড়া রোদেও ছাদ গরম না হয় এবং ভিতরের তাপমাত্রা ঠান্ডা থাকে। বৃত্তাকার নকশার এই খামার বাড়িতে বাতাস চলাচলের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে হেড রুম। নিম, কাঁঠাল ও সেগুন গাছের কাঠ তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, তাই ঘর নির্মাণে সাধারণ কাঠ ব্যবহার না করে মণিকন্দন এসব কাঠ ব্যবহার করেছেন।


বাড়ির চারপাশে সবুজ রাখতে এবং প্রকৃতির মাঝে থাকতে তিনি বাড়ির আশেপাশে ৪০টি গাছ লাগিয়েছেন যার মধ্যে রয়েছে আম, চিকু, কমলা, ডুমুর ইত্যাদি গাছ। তিনি ঘরটি এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যে, মে মাসে যখন গরম থাকে তখন রাত ১০টার মধ্যে তাঁর বাড়ির ভিতরের তাপমাত্রা খুব ঠান্ডা হয়ে যায়, এছাড়া দিনের বেলায় প্রাকৃতিক বাতাস আসতে থাকে, যার কারণে এসি, কুলারের প্রয়োজন হয় না। মণিকন্দন দ্বারা নির্মিত পরিবেশবান্ধব খামার বাড়ির বাইরে তিনি এবং তাঁর বাবা একসঙ্গে লবঙ্গ এবং গোলমরিচ চাষ করেন।

তিনি ১০০টি নারিকেল গাছ লাগিয়েছেন, যা বাড়ির বাইরের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে এবং তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণে রাখে। মণিকন্দনের বাবা, মা এই পরিবেশ বান্ধব খামার বাড়িতে থাকেন এবং সবজি চাষ করেন। একই সঙ্গে মণিকন্দন ও তার স্ত্রী ছুটির দিনে সেখানে যান। ক্ষেতে ফলানো ফল ও সবজি সেচের জন্য জল সংগ্রহ করতে তিনি বাড়িতে একটি ট্যাঙ্ক তৈরি করেছেন, যাতে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করা হয়। তিনি রান্নাঘরের বর্জ্য ও গোবর থেকে তৈরি কম্পোস্ট, ফল ও সবজি চাষে সার হিসেবে ব্যবহার করেন।