কোনো মানুষ নয় বুলেট ট্রেনের এই জটিল সমস্যার সমাধান করেছিল এক মাছরাঙ্গা! জানুন কীভাবে..

যে বুলেট ট্রেন আজ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই ট্রেনের পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯৬৪ সালের অক্টোবর মাসে। ১৯৬৪ সালে অলিম্পিক শুরু হওয়ার ঠিক দশ দিন আগে এই ট্রেনের উদ্বোধন করেছিল জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় আমরা বুলেট ট্রেনের প্রতি হিসাবে শুধুমাত্র জানতাম জাপানকে। দিন যত এগিয়েছে, ততই গতিবেগ বেড়েছে বুলেট ট্রেনের। কিন্তু সঙ্গে তৈরি হয়েছে আরেকটি নতুন সমস্যা সেটি হল সনিক বুম বা শব্দাঘাত।

এবার চলুন জানি কি এই সনিক বুম? শব্দের থেকে দ্রুত গতিতে যখন কোন বস্তু এগিয়ে চলে, তখন সেই বস্তুর গতিবেগের ফলে যে শব্দ তরঙ্গ তৈরি হয় এবং সেই তরঙ্গের ফলে যে বিস্ফোরক শব্দ তৈরি হয় তাকেই বলা হয় সনিক বুম। দ্রুতগতিতে ছুটতে সক্ষম হলেও বুলেট ট্রেনের গতি কখনোই শব্দের থেকে বেশি ছিল না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যে ট্রেন তৈরি করা হলো তার গতিবেগের ফলে তৈরি হচ্ছিল সনিক বুম।

টোকাইডো শিনকাসেন জাপানের অন্যতম ব্যস্ত রেললাইন। এই স্টেশন থেকে যে সমস্ত বুলেট ট্রেন চলে, সেই ট্রেনগুলিকে বেশ কয়েকটি সুরঙ্গের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। সুরঙ্গ থেকে ট্রেন গুলি বেরোনোর সময় বিকট শব্দ তৈরি হতো যা প্রায় ৪০০ মিটার দূর থেকে শোনা যেত। সুরঙ্গ গুলির আশেপাশে বসবাসকারী বাসিন্দারা এই বিষয়ে অভিযোগ জানাতে শুরু করে।

বুলেট ট্রেনটি যখন সুরঙ্গতে প্রবেশ করতে তখন সুরঙ্গে অবস্থিত বায়ুর ওপর সেগুলি চাপ সৃষ্টি করত। ট্রেনের গতিবেগ ১ কিলোমিটার বাড়লেই সুরঙ্গের ভেতরে চাপ বাড়তো ৩ গুণ। এইভাবে ট্রেনগুলি যখন সুরঙ্গ থেকে বের হত তখন ট্রেনের সামনে থাকা বায়ুচাপ বাইরে বেরোনোর সুযোগ পেয়ে বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দ তৈরি করত। ওভারহেড তারের সঙ্গে লাগানো প্যানটোগ্রাফগুলি থেকে শব্দ তৈরি হতে সবথেকে বেশি।

এই সমস্যার সমাধান করার জন্য ইঞ্জিনিয়াররা প্রথমে প্যানটোগ্রাফের ডিজাইন বদলাতে উদ্ধত হলেন। অবশেষে ১৯৯৪ সালে প্যাঁচার ডানার আকৃতিতে বানালেন নতুন প্যান্টগ্রাফ। বুলেট ট্রেনকে যখন আরো গতিশীল করার কথা, ঠিক তখনই এই নতুন সমস্যার সমাধান করতে মাঠে নেমে পড়লেন ইঞ্জিনিয়াররা।

ইঞ্জিনিয়ারদের দলের আধিকারিক এইজা নাকাতসুকে জানিয়েছিলেন, ট্রেনগুলি যখন কোন সুরঙ্গে প্রবেশ করে তখন মনে হয়, সেগুলি আকারে আরো ছোট হয়ে গিয়েছে। সুরঙ্গের বায়ু পরিবর্তনের ফলে এটা হয়ে থাকে। পক্ষী বিশারদ নাকাতসুর মনে তখন প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীতে এমন কোন প্রাণী কি আছে যাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের জন্য প্রতিনিয়ত এরকম বায়ু চাপের পরিবর্তন সামলাতে হয়? তখনই হঠাৎ করে মনে পড়ে গেল মাছরাঙ্গা পাখির কথা।

মাছরাঙ্গা তার শিকার ধরতে নিম্নচাপ অঞ্চল থেকে উচ্চচাপ অঞ্চলে ঘন্টায় প্রায় ২৫ মাইল বেগে ঝাঁপ দিতে পারে। ঝাঁপ দেবার সময় জলে কোন তরঙ্গে সৃষ্টি হয় না কারণ মাছরাঙ্গা সুদীর্ঘ এবং ছুঁচালো চঞ্চু। এই কথা মাথায় আসতেই ইঞ্জিনিয়াররা নানা রকম মডেল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দেন। অবশেষে যে মডেলটি পরীক্ষায় পাশ করে সেটির অগ্রভাগ প্রায় মাছরাঙ্গা ঠোঁটের মতই দেখতে।

নতুন এই ডিজাইন নিয়ে যখন তৈরি হলো বুলেট ট্রেন, তখন যাত্রাপথে সুরঙ্গ মধ্যে বিস্ফোরণের শব্দের মাত্রা অনেকাংশে হ্রাস পেয়ে গেল। নির্ধারিত ৭০ ডিসিবেলের মধ্যেই থাকলো শব্দের মাত্রা। তবে শুধুমাত্র শব্দ নয়, বিদ্যুতের ব্যবহার কমে গেলে অনেকটাই। পুরনো ট্রেনের থেকেই নতুন ট্রেনে বায়ুর চাপ হ্রাস পেল ৩০ শতাংশ। ১৯৯৭ সালের ২২ মার্চ সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য চালু হলো এই নতুন ডিজাইনের বুলেট ট্রেন।

নতুন মডেলের ট্রেনটি সর্বোচ্চ ৩০০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে ছুটতে পেরেছিল যা সেই সময় বিশ্ব রেকর্ড গড়ে তুলেছিল। নাকাতসুর এই নির্ভুল পদক্ষেপকে বলা হয় বায়োমিমিক্রি। এর অর্থ, পার্থিব কোন জীবের আকৃতি দেখে কোন কাঠামোর নকশায় বদলে নিয়ে প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করা। এক্ষেত্রে মাছরাঙ্গার চঞ্চুর আদলে তৈরি হলো বুলেট ট্রেন যা আজও বর্তমান।