করোনার জেরে চলে গেলেন শ্যামনগরের “ভগবান”, সংক্রমনের তোয়াক্কা না করে দিনের পর দিন রোগী দেখেছেন তিনি…

মাসখানেক ধরে লড়াই করার পর অবশেষে হেরে গেলেন উত্তর 24 পরগনার শ্যামনগরের ডক্টর প্রদীপ ভট্টাচার্য। তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই ঘটনার পর গোটা শ্যামনগর জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ওখানকার গ্রামের মানুষ এনাকে ভগবান হিসেবে দেখতেন। যেদিন থেকে করোনার সংক্রমণ শুরু হয়েছে সেদিন থেকে রাজ্য জুড়ে লকডাউন শুরু হয়েছে। তবে ডক্টর প্রদীপ ভট্টাচার্যের কাছে লকডাউন বলে কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষের সেবায় তিনি সব সময় নিজেকে উৎসর্গ করে দিতেন।

কোন দিন তিনি একজন রোগীকেও চিকিৎসা না করে ফিরিয়ে দেননি। বর্তমানে রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে। অনেকেই বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন এরকম খবর উঠে আসছে। আর ঠিক এই সময়ে প্রদীপ বাবু সমস্ত সুরক্ষা বিধি মেনে করোনা’কে ভয় না করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এই ভাবেই চিকিৎসা করতে করতে তিনি নিজেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সম্প্রতি 8 জুলাই তার করোনা ভাইরাসের লক্ষণ দেখা যায়।

এরপর পরীক্ষা করা হলে 13 জুলাই রিপোর্ট পজেটিভ আসে। এরপর তাকে মুকুন্দপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর তিনি করোনার সঙ্গে লড়াই করতে থাকেন সেখানে। এরই মাঝে তার স্ত্রী এবং ছেলেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু কয়েকদিন পরেই তার স্ত্রী এবং ছেলে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু প্রদীপ বাবু এরপরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। আর এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও সংকটজনক হয়ে উঠে। এই সময় তার চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়ে। আর তার চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসেন শ্যামনগরের বাসিন্দারা।

 

তারা তাদের ভগবানকে সুস্থ করে তুলতে চাঁদা তোলা শুরু করেন। চাঁদা তুলে তারা বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন। এমনকি ডাক্তারবাবুর সুস্থ হওয়ার জন্য গ্রামবাসীরা প্রার্থনা ও শুরু করে দেন। কিন্তু অবশেষে করোনার কাছে হেরে গেলেন ডাক্তারবাবু প্রদীপ ভট্টাচার্য। গত 10 ই আগস্ট তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরেই শোকের ছায়া গোটা গ্রাম জুড়ে। মৃত ডাক্তারবাবুকে শেষবারের মতো দেখতে চাইছিলেন গ্রামবাসীরা। ডাক্তারবাবু যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সেখানে 15 লক্ষ টাকা বিল হয়েছিল।

গ্রামবাসীরা অর্থ আদায় করে সেই টাকা দিয়ে ডাক্তার বাবুর মরদেহকে নিয়ে আসেন তাদের গ্রামে। এরপরে মঙ্গলবার মৃত ডাক্তার বাবুকে তার নিজের জন্মভূমিতেই নিয়ে আসেন গ্রামবাসীরা। ডাক্তারবাবুকে শেষবারের দেখার জন্য শ্যামনগরের বাসিন্দারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। এক গ্রামবাসী জানান যে,” ডাক্তার প্রদীপ ভট্টাচার্য শুধুমাত্র একজন ডাক্তার ছিলেন না তিনি আমাদের ভগবান ছিলেন। যেকোনো পরিস্থিতি হোক না কেন উনি আমাদেরকে কোনদিন চিকিৎসা না করিয়ে ফিরিয়ে দিতেন না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে অন্যান্য ডাক্তাররা রোগীর জ্বর শুনলেই আর চিকিৎসা করছেন না সেখানে প্রদীপ বাবু সমস্ত রোগের চিকিৎসা করে গেছেন। প্রদীপ বাবুর মৃত্যুতে আমাদের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এরকম মানুষ হয়তো খুব কমই দেখা যায়।করোনা মোকাবিলার জন্য প্রদীপ বাবু মুখ্যমন্ত্রীর তহবিলে 51,000 টাকা দান করেছিলেন। আজ আমরা আমাদের ভগবান কে হারিয়ে ফেললাম।”