দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে গিয়ে একাধিকবার কুড়িয়েছেন অভিশাপ, অবশেষে বুকভরা অভিমান নিয়েই পরলোক গমন সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়

উনিশ শতকের যে সময়টা টলিউডে রাজত্ব করছেন প্রসেনজিৎ এবং ঋতুপর্ণা, ঠিক সেই সময়ে খলনায়িকার কথা মাথায় এলে আমাদের সকলের আগে মাথায় আসে সংঘমিত্রা ব্যানার্জীর নাম। একাধারে প্রায় কয়েকশো সিনেমা তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। প্রত্যেকটি চরিত্র দুর্দান্ত অভিনয় ক্ষমতার জোরে জীবন্ত করে তুলতেন তিনি। তবে যে মানুষটিকে পর্দায় আমরা দেখে ঘৃণায় মুখ সরিয়ে নিতাম, জানলে অবাক হবেন সেই মানুষটি ছিল একেবারে অন্যরকম।

বাস্তবে ভীষণ হাসি খুশি এবং স্নেহময় মহিলা ছিলেন তিনি। শুধুমাত্র অভিনেত্রী হিসেবে ভাল ছিলেন তা নয়, তাঁর ছিল একাধিক গুন। আজ এই দুর্দান্ত অভিনেত্রীর সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের বলব। ১৯৫৬ সালের ৮ আগস্ট বেনারসের জন্মগ্রহণ করেছিলেন সংঘমিত্রা ব্যানার্জি। পিতার নাম সুভাষ কুমার ব্যানার্জি এবং মা ছিলেন সান্তনা ব্যানার্জি। জন্মের পর খুব ছোট বয়স থেকেই মা-বাবা বেনারস থেকে চলে আসেন কলকাতায়। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সংস্কৃত নিয়ে অনার্স করেছিলেন সংঘমিত্রা। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্স করেছিলেন।

শুধু মাত্র এখানেই শেষ নয়, বাংলা সাহিত্যে বিশেষ ডিপ্লোমা করেন অভিনেত্রী। মেধাবী ছাত্রী হবার দরুণ প্রথমে কলেজের প্রফেসর হতে চেয়েছিলেন তিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি দুর্দান্ত নাচ করতে পারতেন এই অভিনেত্রী। একাধিক নামী নৃত্য শিল্পীর থেকে তালিম নিয়েছিলেন তিনি। এমনকি টোকিও থেকে ক্লাসিকাল ডান্স এর ডিপ্লোমা করেছিলেন এই অভিনেত্রী। ১৯৮১ সালে ভারতীয় সংস্কৃতির ডেলিগেট হিসেবে গিয়েছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে।

এই গুণী মানুষটির কিভাবে অভিনয় জগতে প্রবেশ হল, প্রশ্ন জাগতে পারে অনেকের। তাহলে বলি, মহানায়ক উত্তম কুমারকে দেখার খুব ইচ্ছা ছিল সংঘমিত্রার। কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী শুটিং ফ্লোরে পৌঁছে যান মহানায়ককে দেখতে। কাকতালীয়ভাবে সেখানেই পরিচালকের নজরে চলে আসেন অভিনেত্রী। আশ্চর্যজনকভাবে পছন্দের অভিনেতা উত্তম কুমারের সাথে প্রথম শট দিয়েছিলেন সংঘমিত্রা। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয় জগতে যাত্রা শুরু হয়ে যায় তার।

অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, ছবিতে রামজি দাসি সাধিকার চরিত্রে অভিনয় করে সকলের নজর কাড়েন তিনি। বলিউড সিনেমা পেয়ে যায় তাঁর মনের মত খলনায়িকাকে। এরপর কার্যত পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তার প্রানবন্ত অভিনয় তাঁকে মানুষের ভালোবাসার এবং একইসঙ্গে ঘৃণার পাত্র করে দেয়।

ব্যক্তিগত জীবনে অভিনেত্রী বিয়ে করেন জয়ন্ত ব্যানার্জিকে। তবে দুর্ভাগ্যবশত শেষ জীবনে মরণব্যাধি ক্যান্সার ধরা পড়ে অভিনেত্রী। অভিনয় জগৎ থেকে একেবারে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। অবশেষে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে ৬০ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। এই নায়িকার মহাপ্রয়াণের পর তাঁর ছেলে অনুরাগ ব্যানার্জি বলেন, মা চেয়েছিলেন শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর যেন সকলের খবরটা জানতে পারে। আমি শুধুমাত্র নির্দেশ মেনেছি।

কিন্তু কেন অভিনেত্রী নিজের রোগী এবং মৃত্যুর খবর সকলের থেকে লুকিয়ে রাখলেন? কোন অভিমান বুকে চেপে রেখে চলে গেলেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তর আজো সকলের কাছে অজানা।