দেশের জন্য ১৮ বছর কারাবাস, তারপরেও স্বাধীন ভারতে খালাসির কাজ করেছেন বর্ধমানের বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত

বিপ্লব,বিপ্লবী সংগ্রাম শব্দগুলো শুনলে বুকের রক্ত গরম হয়ে ওঠে হয়ত৷ কিন্তু পাশাপাশি এই প্রশ্নগুলোও ঘোরাফেরা করে। বিপ্লব করে কী হয়? স্বাধীনতা সংগ্রামীরা কী সত্যি স্বাধীন ভারতে মর্যাদা পেয়েছিলেন? দেশের জন্য ১৮ বছর জেল খেটেও, স্বাধীন ভারতে সম্মান পাননি বর্ধমানের খণ্ডঘোষের বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত। স্বাধীন ভারতে বেঁচে থাকতে কখনও বেকারিতে, কখনও লরির খালাসির কাজ করতে হয়েছে। ভগৎ সিংহ এবং রাজগুরুর সঙ্গে; স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন৷

 

 

শেষ জীবনে যখন অসুস্থ অবস্থায় দিল্লির এইমসে ভর্তি হলেন তখন ভগৎ সিংহের মা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। বটুকেশ্বরের শেষ ইচ্ছে ছিল; ভগৎ সিংহ, সুখদেব, রাজগুরুদের সঙ্গে একই শ্মশানে দাহ হওয়ার। একমাত্র সেই ইচ্ছেই পূর্ণ হয়েছিল তাঁর।১৮ নভেম্বর ১৯১০ সালে বর্ধমানে জন্ম হয়; বটুকেশ্বর দত্তের। শৈশব বাংলায় কাটানোর পর; উচ্চশিক্ষার জন্য কানপুরে যান। কানপুর কলেজে পড়ার সময় বটুকেশ্বর দত্ত’র সঙ্গে আলাপ হয়, শচীন্দ্রনাথ সান্যালের।

 

শচীন্দ্রনাথ ছিলেন ভারতে ইংরেজের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাণপুরুষ। রাসবিহারীর বসুর একনিষ্ঠ অনুগামী ছিলেন শচীন সান্যাল ওরফে লাট্টু। দেশ ছাড়ার আগে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দায়িত্ব বারাণসীর লাট্টুবাবুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন রাসবিহারী। ভারতের এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে জব্দ করতে, ইংরেজ সরকার ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৯১৫ তৈরি করে এবং পুলিশকে যা ইচ্ছা তাই করার ছাড়পত্র দিয়েছিল ইংরেজ সরকার যাতে যেন তেন প্রকারে তাকে শায়েস্তা করা যায়।

 

 

বাধ্য হয়েই দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলমুক্ত করার শপথ নিয়ে; দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেন রাসবিহারী। তাঁকে সম্পূর্ণ ভাবে সাহায্য করেন শচীন্দ্রনাথ। ১৯১৫ সালের মে মাসে ছদ্মবেশে দেশত্যাগ করেন রাসবিহারী৷ তাকে জাহাজে তুলতে যান শচীন সান্যাল। এরপর সংগঠনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন শচীনবাবু। মোহনদাস করমচাঁদ গাঁধীর সঙ্গে; দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ ছিল৷ ১৯২০ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত; দু’জনের মধ্যে বিতর্ক ইয়ং ইন্ডিয়া পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেই লেখা পড়েই বটুকেশ্বর; শচীনবাবুর প্রতি টান অনুভব করেন। রাসবিহারীর আর্দশেই বটুকেশ্বরকে তৈরি করেছিলেন শচীন সান্যাল।

 

আজ সকাল 11 টায় বিশ্বভারতীর শতবর্ষ উদযাপনে নিজের বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী

 

এরপরে বটুকেশ্বরের সঙ্গে পরিচয় হয় শচীনবাবুর আরেক শিষ্য ভগৎ সিংহের। শচীনবাবু আন্দামানে সেলুলার জেলে থাকার সময়ে; ভগৎ সিংহ অ্যাসেম্বলি সভায় বোমা ছোঁড়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় বটুকেশ্বর দত্তকে। ভগত সিং ও অজয় ঘোষের সঙ্গে; তত্কালীন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়নের সদস্যপদ গ্রহণ করেন বটুকেশ্বর দত্ত। এরপর হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত হন৷

পাবলিক সেফটি ও ট্রেড ডিসপুট বিল এই দুটি বিলের প্রতিবাদে; সংসদে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগত সিং সংসদে জোড়া বোমা ফাটানোর পরেও দর্শকাসন থেকে পালিয়ে যান নি৷ দুই তরুণের মুখে তখন ইনকিলাব জিন্দাবাদ। ইংরেজ পুলিশ গ্রেফতার করেন তাঁদের। বিচার হয়। আন্দামানে সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাবাস দেওয়া হয় বটুকেশ্বর দত্ত-কে। ১৪ বছর পরে; যক্ষা আক্রান্ত হওয়ায় ছাড়া পান। কিন্তু ফিরে, আবারও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং চার বছরের জন্য মোতিহারি জেলে থাকেন৷

 

এরই মধ্যে দেশ স্বাধীন হলে জেল থেকে ছাড়া পান। ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে বিয়ে করেন আন্দোলনের সঙ্গী অঞ্জলি’কে। জীবনের ১৮ বছর প্রায় টানা জেল খেটেছেন বটুকেশ্বর দত্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ভেবেছিলেন, এ বার নতুন দেশ গড়া হবে কিন্তু কংগ্রেস সরকারের আমলে তাঁর সেই স্বপ্ন সফল হয় নি। স্বাধীন ভারতে কোনও স্বীকৃতি পাননি বটুকেশ্বর। ইতিহাসে নাম উঠেছে শুধুই কংগ্রেস নেতাদের। প্রচণ্ড আর্থিক দুরবস্থা থেকে মৃত্যুতেই মুক্তি মেলে তাঁর। মোদী সরকারের সময় বর্ধমান স্টেশনের নামকরণ করা হয় বটুকেশ্বর দত্তের নামে।