ভবিষ্যতে জলের মধ্যে ডুবে যেতে চলেছে ৭ টি বড় শহর সহ ১৫ মিলিয়ন মানুষ, প্রকাশ্যে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট

সম্প্রতি জার্মানির বন শহরে ফিজি কর্তৃক আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক আন্তর্জাতিক ফোরাম কনফারেন্স অব পার্টিজের ২৩তম অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে অন্য অনেক আলোচনার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিশেষ কিছু নিরাপত্তাঝুঁকি উঠে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকি। ফিজির রাষ্ট্রপ্রধান জর্জ কনরোটের বক্তব্যে ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসমূহের ওপর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার ফলে যে অস্তিত্বের ঝুঁকি তৈরি হবে, তার বিশদ বর্ণনা উঠে এসেছে।

কিন্তু এই ঝুঁকি যে শুধু ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রসমূহের ওপরই রয়েছে তা নয়, বরং উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলীয় সব দেশের ওপর কমবেশি ঝুঁকি রয়েছে। এর প্রথম সারিতে রয়েছে এশিয়ার ৭ টি শহর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যেসব নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বে পড়বে, তার অনেকটাই এশিয়া মহাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সমগ্র পৃথিবীতে নানা আসন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে মানুষের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আধুনিক জীবনযাত্রা অনুসারে চলতে গিয়ে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানের সূত্র মেনে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে জলের আয়তনও বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া মেরু অঞ্চল ও পর্বতচূড়ায় অবস্থিত বরফ গলে যাওয়ার ফলে জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১১ থেকে ৩৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় বড়সড় কোনো ভাঙন দেখা দিলে এটা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সারা বিশ্বের নিম্নাঞ্চলের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার মধ্যে ভারত অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক আন্তসরকার সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) একটা গবেষণা বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার (৩৯.৩৭ ইঞ্চি) বাড়লে ভারতের সমুদ্রতীরবর্তী শহরগুলি বিলীন হয়ে যাবে।

কিন্তু এটা নিঃসংকোচে বলা যায়,সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কিছু দ্বীপরাষ্ট্র। মালদ্বীপ, পাপুয়া নিউগিনি এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলো পুরোপুরি জলে তলিয়ে যাবে। এসব দেশ পুরোপুরি নিমজ্জিত হওয়ার আগেই বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। এ ছাড়া পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা বেশ ঝুঁকিতে রয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, বিশ্বের বৃহৎ ১০টি মেগাসিটির মধ্যে ৮টিই সমুদ্র–তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত। পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ সমুদ্রোপকূল থেকে ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে।

তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বিভিন্ন দেশের বর্তমান সামুদ্রিক সীমানা পরিবর্তিত হবে। দ্বীপরাষ্ট্রগুলো পুরোপুরি তলিয়ে গেলে সংলগ্ন সমুদ্রসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাবে। সীমানার সামান্য পরিবর্তনের ফলেই ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি (ইউএনসিএলওএস) কর্তৃক নির্ধারিত সামুদ্রিক সীমা পরিবর্তিত হবে। এর ফলে পরিবর্তিত নতুন সমুদ্রসীমা নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে।

সাগরের মধ্যে যে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে, সেটা নিয়ে এবং গভীর সমুদ্রে প্রবেশাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেবে। আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কে তিক্ততা এমনকি সংঘাত দেখা দেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। লবণাক্ত জলের সংক্রমণের কারণে বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং ফসলের গুণগত মান পরিবর্তিত হবে। গবেষণা বলছে, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, গভীরতার পরিবর্তন এবং জলের রাসায়নিক গুণগত মানের পরিবর্তনের ফলে মাছের অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

অনেক সামুদ্রিক প্রাণী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কারণ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি তাদের শ্বসন, বাস্তুসংস্থান ও শারীরিক বৃদ্ধির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। খাদ্যনিরাপত্তা চরমভাবে ব্যাহত হবে। প্রধানত যেহেতু প্রচুর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাবে আর বিপুল জায়গা যদি তলিয়ে না–ও যায়, লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে উৎপাদনক্ষমতা কমে যাবে। লবণ সংক্রমণের কারণে সেচকাজ কষ্টসাধ্য হবে এবং তার ফলে ফসল উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কমে যাবে। ভিয়েতনামের মেকং নদী ও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের রেড রিভারের সংলগ্ন অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ চাল উৎপাদন ব্যাহত হবে।

জ্বালানি অবকাঠামো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পারমাণবিক রি-অ্যাক্টরকে ঠান্ডা রাখার জন্য এতে নিরবচ্ছিন্ন জলের সরবরাহ প্রয়োজন। এ জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সাধারণত সমুদ্রোপকূলে নির্মাণ করা হয়। জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যার ফলে রি-অ্যাক্টরের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ক্ষেত্রে ফুকুশিমা বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভিজ্ঞতা স্মরণ করা যেতে পারে, যেটা ২০১১ সালের সুনামিতে জলেতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ফলে তেজস্ক্রিয় রশ্মি ও পদার্থ সেখানকার জলেতে ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল।সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সারা বিশ্বের অর্থনীতির ওপর প্রতিকূল প্রভাব পড়বে। উপকূলীয় অবকাঠামো—সমুদ্রবন্দর, রাস্তাঘাট ও রেলসংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্দরসমূহের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যাহত হবে।